1. admin@narayanganjtimes.com : ntimes :
  2. ahmedshawon75@gmail.com : ahmed shawon : ahmed shawon
বৃহস্পতিবার, ০৬ মে ২০২১, ১০:১১ পূর্বাহ্ন

“আ মরি মোর বাংলা ভাষা”

রণজিৎ মোদক
  • বুধবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ১৬৬

ফেব্রুয়ারি মাস, ভাষা শহীদদের স্বরণ করার মাস। সালাম, রফিক, বরকত ও নাম না জানা অসংখ্য ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা- ভালবাসা জানাবে সমগ্র বাঙালি জাতি তথা বিশ্ববাসী। মাতৃভাষার জন্য প্রাণদান, বিশ্বের অনন্য এক ইতিহাস।

আ মরি মোর বাংলা ভাষা। এই বাংলা ভাষার সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। ভাষাতত্ববিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, তার বহুল আলোচিত প্রবন্ধ ‘মাগধী প্রাকৃত ও বাংলা’Ñ এ প্রবন্ধে বাংলা ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে তার বহুল বিতর্কিত মত ব্যক্ত করেছেন।

তার মতে, বাংলা ভাষার শুরু হয়েছে ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে। তবে তার পূর্ববর্তী পণ্ডিত কেউ এমন মত পোষণ করেনি। এই বাংলা ভাষাকে তথাকথিত বেশকিছু পণ্ডিত হুতমী ভাষা বলে ব্যাঙ্গ করেছেন।

এমন কী মাইকেল মধুসুদন দত্তও প্রথম জীবনে ইংরেজি ভাষার টানে জাত ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে, ইংরেজি সাহিত্য সাধনায় ব্রতী হন। পরবর্তীতে তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে বাংলা ভাষায় সাহিত্য সাধনা করেন।

তিনি তার তার কবিতায় গেয়ে উঠলেন। ‘হে বঙ্গ ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন’। তিনি বাংলা ভাষা এবং বাঙালি জাতির প্রতি কৃতজ্ঞ চিত্তে মিনতি জানালেন, ‘রেখো মা দাসেরে মনে এ মিনতি পদে’।

জ্ঞানতাপসও তেমনি ১৯১৯ সালে তার ছাত্রদের বলেছিলেন- ‘তোমরা বাঙালি। বাংলার আবহাওয়ায়, বাংলার মাটিতে, বাংলার শস্যে, বাংলার কোলে তোমাদের দেহ গঠিত, পুষ্টি, বর্ধিত’।

বাঙালি মুসলমান মনীষীদের মধ্যে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রথম দেশকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। গোড়া থেকেই তার মধ্যে ধর্ম নিরপেক্ষ চেতনা সঞ্চারিত ছিল।

১৯৪৮ সালের ৩১শে ডিসেম্বর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে তিনি কালজয়ী উক্তি করেন। বলেছিলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য, আমরা বাঙালি।

মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছে যে, তার মালা তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গিঁ দাড়িতে ঢাকবার জো-টি নেই’।

বাঙালিত্বের সপক্ষে যিনি সর্ব প্রথম পাকিস্তানের শোষণবাদী সাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর চপেটাঘাত করেন। বাঙ্গালির ভাষা আন্দোলনে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে ছিলেন।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হওয়ার পর মি. জিন্নাহ ও তার সমমনা পরিষদ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার নামে বাঙালির বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। কার্জন হলে ঘোষণা করেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।

এ ঘোষণার বিরুদ্ধে বাঙালি সমাজ প্রতিবাদে মূখর হয়ে ওঠে। শুরু হলো মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলন। প্রথমে এগিয়ে এলো ছাত্র সমাজ। পাকিস্তান সৃষ্টি লগ্নে এদেশের সমাজ পশ্চিম পাকিস্তানের সংগত ভাব বুঝতে পারেন।

তারা ধর্মের নামে এদেশের সহজ সরল মানুষকে পুজি করে ফায়দা লুটে। বাঙালি মুসলমানদের মাতৃভাষা বাংলা- এটিকে জ্যামিতির স্বত:সিদ্ধের ন্যায় সোজা কথা বলে দিয়েছেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।

‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ অগ্নিঝরা আন্দোলনে ১৯৫২ সালে ২১ শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার। এতে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। পাক সরকার বাধ্য হয় তাদের সিদ্ধান্ত পাল্টাতে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সুফল আসতে শুরু হয়।

১৯৫৬ সালে, সংবিধানে উর্দুর সাথে বাংলা ভাষার মর্যাদা লাভ করে। পূর্ব বাংলার গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নতুন আশার সঞ্চার হয়। অপরদিকে পাকিস্তানের শোষকশ্রেণী ১৯৫৮ সালে ৭ অক্টোবর সামরিক জান্তা সংবিধানকে পদদলিত করে ক্ষমতা দখল করে।

তারা পাকিস্তানের জাতীয় ঐক্য ও সংহতি এবং ইসলামের নামে বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ শুরু করে। বেতার টেলিভিশনে রবীন্দ্র সাহিত্য ও রবীন্দ্র সঙ্গীতের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। আইয়ুব খানের শাষনের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু হয়।

১৯৬২ সালে ৩০শে জানুয়ারি করাচিতে সোহরাওয়ার্দী গ্রেফতার হন। শুরু হলো ছাত্র ধর্মঘট। ঢাকায় শেখ মুজিবুর রহমান, মানিক মিয়া, তাজউদ্দিন আহমদকে গ্রেফতার করা হয়। শুরু হয় ছাত্র-গণ আন্দোলন।

ঢাকায় প্রেসিডেন্ট বাসভবন ঘেরাও করার চেষ্টা করা হয়। আইয়ুব খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করে। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের ভ্রুনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ বপন করা হয়। উত্তাল সাগরের ঢেউ গর্জে উঠে। ‘তোমার আমার ঠিাকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’। ‘তুমি কে আমি কে বাঙালি বাঙালি’।

ভাষা আন্দোলনে বাঙালির মননে ফুটে ওঠে বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির বিশাল সাহিত্য ভাণ্ডার। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর বুক চিরে বেড়িয়ে এলÑ ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো, একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি।’

কালজয়ী বেদনাবিধুর অমর সঙ্গীত। বাংলা ও বাঙালির আত্মায় স্থান করে নেয় শোকশক্তি রূপে। ভাষার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন, শুধু তাদের জন্যই নয়। আমাদের মাতৃভাষার জন্য যারা কাজ করেছেন তাদের সবার কাছে বাঙালি জাতি চিরঋণী।

কবি শাহ মুহাম্মদ সগীর, সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কবি হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, কবি জসীমউদ্দিন, কবি শামসুর রাহমান, কবি গোলাম মোস্তফা, এমনকী চণ্ডীদাসের অবদানও কম নয়।

এককালের হুতমী ভাষা আজ বিশে^র ২৫০ শতাধিক ভাষার মধ্যে ৮ম স্থান দখল করেছে। এ সবই আমাদের পূর্ব পুরুষ ও বর্তমান বাংলা ভাষাপ্রেমি কবি সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সুধীজনদের ভালোবাসায়।

জ্ঞান তাপস ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত এক সংবর্ধনা সভায় বলেছিলেন, ‘মাতা, মাতৃভাষা আর মাতৃভূমি প্রাণ অধিক প্রিয়; প্রত্যেক মানুষের পরম শ্রদ্ধার বস্তু। মাতা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি যারা অনুরাগহীন তারা এক প্রকার জন্তু বিশেষ’।

হাজার বছরের পুঞ্জিত প্রেম ভালোবাসা ও ত্যাগের ফসল আজকের আমাদের মাতৃভূমি স্বাধীন বাংলাদেশ। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সেই সত্যকে জেনে দেশ ও দেশের মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে আন্দোলন করে কারা নির্যাতিত হয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ ঢাকায় বিশাল জন সমাবেশে বাঙালিকে স্ব-অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হতে আহ্বান জানান। পরবর্তীতে ২৬শে মার্চ বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং পাক বাহিনীর হাতে বন্দি হন। দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

শুধু তাই নয়, কারামুক্তির পর তিনি বাংলা ভাষাকে বিশে^র দরবারে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে জাতিসংঘে বাংলায় তার ভাষণ দান করে। তিনি বাঙালি জাতি, বাঙালির নিজস্ব দেশ ও বাংলাভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বিশে^র দরবারে। এ এক স্বর্ণজ্জ্বোল ইতিহাস।

তিনি তার আদর্শের বিপরীতে মাথা নত করেন নাই। তিনি স্বপ্ন দেখেছেন সোনার বাংলায় সোনার মানুষ গড়ে উঠবে। এ দেশের ভাষা, মাটি-মানুষকে আরো বেশি ভালোবাসবে।

আসুন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা আমাদের অতীতকে স্বরণ করে আগামী দিনের সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে শহীদবেদী মূলে দাঁড়িয়ে নতুন শপথ করে বলি, ‘‘আ মরি মোর বাংলা ভাষা।’’

লেখক-
শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সভাপতি, ফতুল্লা রিপোর্টার্স ক্লাব।
ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ।

নিউজটি আপনার সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরও সংবাদ
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ বা ব্যবহার করা  সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব www.narayanganjtimes.com কর্তৃক সংরক্ষিত।
Customized By NewsSmart