পাঁচ আগস্টের পটপরির্তনের পর নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিতে এখন প্রধান দুই শক্তি হচ্ছে বিএনিপি ও জামায়াত। দুই দলই সমানতালে সাংগঠনিক কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর আলোচনায় স্থানীয় নির্বাচন। আর এই নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতিতে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার আগেই আগাম মেয়র প্রার্থী ঘোষণা, ওয়ার্ড পর্যায়ে কাউন্সিলর প্রার্থী নির্ধারণ এবং জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদে সম্ভাব্য প্রার্থী ঠিক করে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। সেই দিক থেকে একেবারেই পিছিয়ে রয়েছে বিএনপি।
শুধু তাই নয়, বিএনপিতে দলীয় কোন্দল এবং বিভিন্ন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। এতে শুধু সাংগঠনিক প্রস্তুতি নয়, দুই দলের রাজনৈতিক ভাবমূর্তির প্রশ্নও সামনে আসছে। জামায়াত যখন নিজেদের সংগঠিত ও স্থানীয় নির্বাচনী প্রস্তুতিতে সক্রিয় হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, তখন বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে দলীয় ঐক্য ও ভাবমূর্তি ধরে রাখা।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে মাওলানা আব্দুল জব্বারকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াত। পাশাপাশি বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী নির্ধারণ এবং জেলার ইউনিয়ন পর্যায়ে চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজও চালিয়ে যাচ্ছে দলটি। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে নগর থেকে গ্রাম পর্যন্ত নিজেদের সাংগঠনিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে তারা।
এসব আগাম উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে তাদের সক্রিয়তা ভোটারদের কাছে একটি দলের প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক সক্ষমতার বার্তা দিতে পারে। জামায়াতের সাম্প্রতিক তৎপরতা সেই সুযোগ করে নিচ্ছে।
বিশেষ করে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ যখন আলোচনায়, তখন জামায়াতের এই সক্রিয়তা রাজনৈতিকভাবে তাদের তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থান তুলে ধরতে পারে।
তবে নারায়ণগঞ্জে বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উপস্থিতি ও স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী নেতৃত্ব রয়েছে। জেলায় ৫ টি সংসদীয় আসনের মধ্যে চার আসনেই বিএনপি জয় লাভ করে কিন্তু বিভিন্ন পর্যায়ে নেতাদের বিরোধ, দলীয় পদ ও প্রভাব নিয়ে টানাপোড়েন এবং নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ দলটির রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে আলোচনার মধ্যে রাখছে।
তবে সেই বিরোধ প্রকাশ্যে এলে সাধারণ মানুষের কাছে দলটির নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিশেষ করে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগও দলটির ভাবমূর্তির জন্য বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠছে। এসব কেন্দ্র করে ধারাবাহিক বিতর্ক তৈরি হলে তার রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে প্রতিপক্ষের জন্যও তা বিএনপির নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি করে।
এ ছাড়া প্রার্থী নির্ধারণের পরেও জামায়াতের স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয় ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার প্রশ্ন আসতে পারে। দলটির নেতা-কর্মীরা কতটা জনসম্পৃক্ততা তৈরি করতে পারেন এবং তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তার ওপরও দলটির ভাবমূর্তি নির্ভর করবে।
নারায়ণগঞ্জে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শুধু প্রার্থী নির্ধারণ কিংবা প্রচার-প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সঙ্গে যুক্ত হবে জন আস্থা, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতার প্রশ্ন। জামায়াতের সামনে রয়েছে বর্তমান তৎপরতাকে ভোটারদের সমর্থনে রূপ দেওয়ার চ্যালেঞ্জ। আর বিএনপির জন্য জরুরি হয়ে উঠছে অভ্যন্তরীণ বিরোধ সামলে দলীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ধরে রাখা।
সব মিলিয়ে, নারায়ণগঞ্জে রাজনৈতিক চিত্রে জামায়াতকে সাংগঠনিক প্রস্তুতিতে সক্রিয় এবং বিএনপিকে অভ্যন্তরীণ বিরোধ সামলাতে ব্যস্ত দেখা যাচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত কে এগিয়ে থাকবে, তা নির্ভর করবে কোন দল নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি, গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব এবং ভোটের সমর্থনে রূপ দিতে পারে তার ওপর।